Categories
অদ্ভুতপুর |

ওঝা গুণিনের ডেরায়

1053 |
Share
| ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০
রাধামাধব মণ্ডল

কথাকার ও সাংবাদিক

ছবি ও গ্রাফিক্স: কমলাকান্ত পাকড়াশী


চোখে অলস এলেই গুপীন ওঝার চেহারাটা ভেসে আসে এখনও! মায়া আলোয় মাখামাখি মুখখানা। সেই যে শেষবারের মতো মনাইয়ের বাড়িতে দেখেছিলুম, আর দেখা হয়নি তারপর! হালকা ছুঁই-মাছের মতো ওড়া শরীর! সাদাসিধা ফতুয়া পায়জামা পরে আসত, মাটি রাস্তা ধরে দূর দেশ থেকে সাইকেলে। অদ্ভুত একপ্রকার শব্দের মাদকতা ছড়িয়ে, লালধুলো উড়িয়ে সাইকেল আসত। কলাটা, মুলোটা না নিয়ে সে ফিরত না। মুখের উপর রোদ-পড়া মরা ঘাসের দাড়ি! কাঁধে কাপড়ের ঝোলা। তাতে একটা মড়ার মাথা, গোটা কয়েক চিরুনি, একটা ছোট বাঁশের টুকরো, চুল-ছেঁড়া একগোছা, কড়ি কয়েকটা এবং থাকত সিঁদুরের একটি কৌটো। রামদাসই তাঁকে প্রথম এনেছিল উলোর ডাঙার উল্লাসপুরে। রামদাস বৈরাগী ছিল পাশের সাগরপুতুল গ্রামের গুণিন! পরিস্থিতি তার আয়ত্তের বাইরে গেলে, রামদাস গুপীন ওঝাকে ডেকে এনেছিল!

সাগরপুতুল গ্রামের পটল মোড়লের নাতনি, কৃষ্ণপ্রিয়া। খুব আদুরে। কৃষ্ণপ্রিয়া, দিনের আলো পড়ে এলেই ছায়া দেখত যখন তখন! বহু ওঝাগিরির পর, তাতে হাত লাগায় গাঁয়ের রামদাস বৈরাগী! ততদিনে ছায়া দখল করে নিয়েছে কৃষ্ণপ্রিয়ার শরীর! যমে মানুষে টানাটানি! শেষ ক্ষমতায়, ঘুমন্ত কৃষ্ণপ্রিয়ার মাথার গোড়ায় প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেও থাকছে না দ্যাখে রামদাস! শিখা হঠাৎই কেঁপে ওঠে, তারপর নিভে যায়। রামদাসের মায়াজিন (এক ধরনের শক্তি) হার মানলে, সে গুপীন ওঝাকে ডেকে এনেছিল! সেবার গুপীন ওঝার দুই-সাধনা (নারী-পুরুষের সাধনা) রক্ষা করেছিল তাকে।


এ গাঁয়ে আজও বাদ্দিবারের (বারবেলায়) খেলা চলে! আমরা এসব মানতুম না। গাবতলায় গিয়ে গাব ফল পাড়তাম। বাড়ির সকলে চিৎকার করত সেই নিয়ে! সেখানেই নাকি যতসব ভূতেদের আড্ডা। তবুও যেতুম! অসম্ভব সুন্দর গাঢ় কালো ছায়ার তলে, নুয়ানো ডাল ধরে ঝুলে চলত আমাদের রামঝোল্লা খেলা! তবে সন্ধেবেলা কালো গাবগাছের বাগানে কেমন যেন শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসত আমাদের। ভুটুনের গা বাজত! ঝিমঝিম করত শরীর! সেসব মিলিয়ে সবেতেই হাসি, আর বড়দের অবজ্ঞা করে বেরিয়ে যেতুম সকলকে ঘুম পাড়িয়ে গ্রীষ্মের দুপুরে! মাঝে মাঝেই সেই গাবগাছের তলায়, বড় কলাপাতায়, পাকা টমেটো-খেত থেকে তুলে এনে, নুন-লঙ্কা-পেঁয়াজ দিয়ে মেখে খাওয়া দাওয়া চলত। সেসব শুনে, সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে আসতেই রেগেমেগে এলোপাথাড়ি দু-এক কথা বলতেন দিদু! সাঁঝবেলায় কাছে বসিয়ে রাঙাদিদি বলতেন চিন্তামণির কথা। সে নাকি চৈত্রের বাদ্দিবারে, চারাবাগানের বেড়ার ওপাশে শ্মশানের কাছে কদম গড়েতে নাইতে গিয়েছিল চুল খুলে! কদম গড়ের কাজলকালো জল! নিজের ছবি, ভিতর থেকে ভেসে আসে! দেখলেই বুক নড়ে ওঠে! সেদিন নাইতে গিয়েই যত বিপত্তি! সেবারই চিন্তামণির গা বাজে! ফিরে বলেছিল সেকথা, বাড়ির সকলের সামনে! সেই থেকেই তিনদিনের জ্বরে পড়ে আর জ্বর থেকে উঠেই সে অন্যরকম মানুষ! হম্বিতম্বি করে বেড়ানো, রাতের অন্ধকারে বাড়ি-হারিয়ে-বেরিয়ে-পড়া, একা একা মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ানো। বহুদিন চলে এসব। ততদিনে শরীরের মাংস খসে, হাড়ে চামড়ার জামায় পড়েছে টান।

এই বাঁচে এই মরে অবস্থা! এমন অবস্থা চলছে বেশকিছু কাল! ডাক্তার, বদ্দিবুড়ি, ঝাড়ফুঁক তুকতাক করেও কোনও পথ মিলছিল না গো! চিন্তার কাচ্চাবাচ্চাদের পাড়ার মেয়েরা নিয়ে গিয়ে তুলেছে আপন আপন ঘরে। তাদের কাছেই থাকে। এদিকে গোটা বাড়িশুদ্ধ মানুষ চিন্তামণিকে আগলে রাখতে পারে না! এমন শক্তি ধরে সে, মাঝে মাঝে! মায়াদৈত্য যেন! সবকিছুই দুমড়ে মুচড়ে ধরে। তার সামনে যেতে চায় না কেউ। পাঁচ ভাগি রশা (দড়ি) ছিঁড়ে ফেলে! অনেককাল পরে, রামদাসের চেষ্টায় কাশী থেকে এক ওঝা এসে চিন্তামণিকে মুক্ত করে। আর সেই অপশক্তিকে মাটির কূপে ভরে নিয়ে যায়। সে ঘটনার পর গ্রামের মানুষ বাদ্দিবারে বিড়াল-বাঁশতলা, এক্ষিণীতলা, তালপুকুর পাড়, ভাগাড়ে মাঠ, ব্রহ্মদৈত্যের নিমতলা, শাল জোল, কাঁদর পাড়, শ্মশান কবরের মাঠ এড়িয়ে চলত।

এসব নিয়েই, গ্রামের মানুষের দিন প্রতিদিন কাটত নিজস্ব আনন্দ-দুঃখে। তবে সেসময় এখন বদলে গেছে! এখনও রাঢ় বাংলার বীরভূম, দুই বর্ধমান, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া জেলার বিভিন্ন গ্রামে রয়েছে লুকিয়ে চুরিয়ে গুণিন, ওঝার দল। তবে সংখ্যা কমেছে! জল-পড়া, তেল-পড়া, তাবিজ-কবচের দোহাই দিয়ে (প্রভাবে) পেটকামড়ানি, পেটকাটা, হেঁচকি, খিদেমন্দা, দুধ-ঠুংরি, ছেলে-কাঁদা সারে আজও। আজও মা-ঠাকুমারা যান সেসব গুপ্তবিদ্যার পাড়ায়। শুধু তাই নয়, মা মনসার দোহাই দিয়ে আজও রাঢ় বাংলার বহু গ্রামে, সাপের কামড়ের বিষ নামাতে এখনও সেই ওঝাই ভরসা! এমনই কয়েকটি মনসাতলার মাহাত্ম্য আঁকড়ে ধরে রয়েছেন গুণিন-ওঝারাই!