
সৌরভ পড়াশোনায় ভালো। বাবা-মায়ের কাছে এ কথা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা বলেন। সে তো ক্লাসে এক থেকে পাঁচের মধ্যে র্যাঙ্ক করে। ইদানীং পঞ্চম-ষষ্ঠ শ্রেণিতে পরপর দু’বছর প্রথম হয়েছে। এ নিয়ে অন্যান্য অভিভাবকরা আলোচনা করে। নিশ্চয়ই ওর মা ও বাবার কানে কথাটা গেছে। সৌরভ শান্ত মেধাবী নিরূপদ্রব ছেলে। নিজে থেকেই ঠিক সময়ে ঘুম থেকে ওঠে। স্কুলে যায়। প্রত্যেক দিনের ক্লাসের পড়া প্রত্যেক দিন করে।
ওর বন্ধুরা স্কুলে ক্ষ্যাপায়, যাতে ও রেগে যায়, বিরক্ত বোধ করে। একবার টিফিন টাইমে দেখা গেল যে সুদামের পেছনে কে যেন কাগজের লেজ বানিয়ে দিয়েছে। সৌরভ সেই অবস্থায় বারান্দার সিঁড়ি ধরে নীচে এসেছে।
অবনী স্যার দেখে ওকে ডেকে বললেন, ‘এই যে সৌরভ শোনো, তোমার পিছনে ওটা কে দিয়েছে?’
সৌরভ অবাক হয়ে বলল, ‘জানিনা তো স্যার!’
অন্য বন্ধুরা দৌড়ে এসে খুলে দেয়।
ক্লাসে যেতে মদনসহ অন্য ছাত্ররা হো হো করে হেসে বলল, ‘কী হল, বাঁদরের লেজ কোথায়?’
সৌরভ রেগে বলল, আমি যদি বাঁদর হই, তোরা তবে কী?’
মদন বলল,‘আমরা মানুষ। তুই একা বাঁদর কারণ তোর লেজ ছিল—’
সৌরভ ক্ষেপে গিয়ে বলল,‘আমি কিন্তু স্যারকে বলে দেব সব। আমার গায়ে পড়ে লাগিস কেন তোরা?’
মদন বলল,‘তুই না মনিটর? ওই জন্য তোর পিছনে লাগে সবাই।’
এই কথা নিয়ে একটু তর্ক বিতর্ক হচ্ছিল। এদিকে টিফিন টাইমও শেষ হয়ে গেছে। সেই সময় অঙ্কের স্যার মৃগাঙ্কবাবু ক্লাসে এলেন। তিনি বললেন,‘সবাই হোমটাস্কের খাতা বের করো।’
সকলেই খাতা বের করল। কিন্তু সৌরভ পারল না।
সৌরভ মৃগাঙ্ক স্যারকে বলল,‘স্যার অঙ্ক কষে খাতা ব্যাগে নিয়ে এসেছি। কিন্তু খাতা দেখতে পাচ্ছি না?’
সৌরভের কথা শুনে রেগে গেলেন মৃগাঙ্কবাবু—‘ফাজলামো হচ্ছে? তোমার গার্জেন ডাকতে হবে? মিথ্যা কথা বলছ না তো?
—না স্যার। ইদানীং দেখছি আমার হোমটাস্কের খাতা চুরি হয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যে কেউ লুকিয়ে রেখেছে।
—অ্যাই, ওর খাতা কেউ নিয়েছ?
সবাই চুপ করে আছে। ইতিমধ্যে সৌরভ গিয়ে মদনের ব্যাগ হাতড়ে বের করল নিজের খাতা।
সে বিস্মিত—‘স্যার, আমার খাতা এই যে মদনের ব্যাগে।’
মৃগাঙ্কবাবুর এমনিতে কড়া মেজাজ।
মদনকে কাছে ডেকে বললেন,‘বলতে পারিস, তোর ব্যাগে সৌরভের খাতা গেল কী করে? খাতার কি পা ছিল?’ মদন কোনো উত্তর দিতে পারল না।
তখন মৃগাঙ্কবাবু মদনকে ডাস্টার দিয়ে ঘা দু’য়েক দিলেন। তারপর বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে কঠিন অঙ্কগুলো চক দিয়ে বুঝিয়ে দিতে বললেন। একটিও অঙ্ক সে পারল না। মৃগাঙ্কবাবু মদনকে এক পায়ে খাড়া হয়ে থাকার শাস্তি দিয়ে চলে গেলেন।
মদন খুব অপমানিত হল। স্যার চলে যাবার পর চুপিসারে মদন ওর বন্ধুদের কাউকে কাউকে ডেকে কানে কানে ফিসফিস করে কিছু যেন বলল।
মদন যে ভালো ছাত্র নয়, এই নিয়ে তার মনে মনে রাগ ছিল। ওর মা-বাবা দু’জনেই ওর রেজাল্ট নিয়ে বকাবকি করেছে। মদন মনে মনে ভাবল— সৌরভ না থাকলেই ভালো। তাই সে উঠে পড়ে সৌরভকে সরানোর চেষ্টা করতে লাগল।
এদিকে সৌরভ তার বাড়িতে এসে মা-বাবাকে এই ঘটনার কথা জানাল। তার কথা শুনে তার মা স্কুলে গিয়ে হেড-স্যারকে বললেন। সবটা শুনে হেড স্যার বললেন,‘বিষয়টা দেখছি’।
এরপর তিনি স্থির করলেন যে নিজেই পরীক্ষা করে দেখবেন প্রকৃতপক্ষে কারা দুষ্টুমি করে।
পরের দিন হেডস্যার বিষয়-শিক্ষককে অফিসের কাজে পাঠিয়ে নিজেই ইংরেজি ব্যাকরণের ক্লাস নিতে গেলেন।
তিনি ক্লাসে ঢুকে বললেন, ‘সীট ডাউন। তোমাদের সুকান্তবাবুর ক্লাস তো?’
—হ্যাঁ স্যার।
—কী পড়া আছে ?
‘Material Noun and Articles’, সৌম্যদীপ দাঁড়িয়ে বলল ।
—বেশ। আমি কতগুলো বাক্য বলে দিচ্ছি লিখে নাও। তারপর শোনো, Material Noun-এর কোনও Plural হয় না এবং তার আগে কোনো Article বসে না। জানো তো?
—হ্যাঁ। সবাই সমস্বরে চেঁচিয়ে বলল।
—লেখো। জলে তেল দ্রবণীয় নয়। দেশীয় ওষুধের একটি প্রধান অনুপান মধু। ছুরি দিয়ে কাচে আঁচড় দেওয়া যায় কি? আর্দ্র বাতাসে রুপোয় মরচে পড়ে না। আজকাল দুধ এক রকম দুষ্প্রাপ্য বস্তু হয়েছে। এই পাঁচটা বাক্য। লিখেছ? এদের ট্রান্সলেট করো। এক একজন দাঁড়িয়ে উত্তর দাও। আমি বোর্ডে আবার লিখে দিচ্ছি। আবারও হেড স্যার বোর্ডে বাংলায় বাক্যগুলি লিখছেন। এমন সময় মদন কাগজের প্লেন বানিয়ে ছুঁড়ে দিল আর হেড স্যারের পিঠে এসে লাগল।
—হাউ স্ট্রেঞ্জ!! হু ইজ ইট?
মদন দাঁড়িয়ে বলল,’স্যার সৌরভ।’
—সৌরভ তুমি করেছ? সে বাক্য গঠনে আত্মমগ্ন। চুপ করেছিল।
—সৌরভ স্ট্যান্ড আপ। শুনছ? বলো তো যেগুলো বলেছি, স্পিক ইন ইংলিশ।
সৌরভ দাঁড়িয়ে পড়ে বলল— ‘Oil is not soluble in water. Honey is an important ingredient indigenous medicine. Can glass be scratched by a knife? Silver does not rust in moist air. Milk has now become almost a rare commodity.
—মদন তুমি দাঁড়াও। বলো— সৌরভ এদিকে এসো।
সৌরভ বেরিয়ে এসে টেবিলের কাছাকাছি দাঁড়াল।
মদন বলতে বলতে আটকে যাচ্ছে। তিন ভাগ ভুল বলছে। হেডস্যার মদনের দিকে এগিয়ে বললেন—‘বলো, সত্যি করে বলো কে এই কাগজের প্লেন ছুঁড়েছে?’
মদনের বন্ধুরা সমস্বরে বলল,‘স্যার সৌরভ ছুঁড়েছে’।
দশচক্রে ভগবানও ভূত হয়ে যায়। সৌরভ মাথা নিচু করে বলল, ‘না স্যার আমি ওসব করিনি’।
তবুও হেডস্যার তাকে বললেন, ‘তুমি এক্ষুনি বইপত্র নিয়ে বাড়ি যাও। তোমাকে এক সপ্তাহের জন্য সাসপেন্ড করা হল। এরপরে স্কুলের কমিটিতে বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
মুখ শুকনো করে চলে গেল সৌরভ। ক্লাস শেষ হবার পর মদনের দল আনন্দে হৈচৈ করতে লাগল।
পরের দিন থেকে সৌরভ আর স্কুলে এল না। এদিকে পরদিন ক্লাসে মদন আর তার বন্ধুরা বলা-কওয়া করছিল যে,‘বেশ হয়েছে সৌরভকে সাসপেন্ড করেছে। ও গরীবের ছেলে— ক্লাসে প্রথম হবে কেন?’ সেই সময়ে ক্লাসে চলে এসেছিল রাবেয়া আর মৌমিতা। তারা যে ক্লাসে রয়েছে সেটা খেয়াল করে নি মদন, ইন্দ্রনীল, সৌম্যকান্তি আর সুভাষের দলটা। ওরা নিজেদের মতো বলে যেতে লাগল। মৌমিতা আর রাবেয়া পুরোটা শুনে চলে গেল হেড স্যারের কাছে।
—মে আই কাম ইন স্যার?
—কাম ইন।
—স্যার— কালকে মদন কাগজের প্লেন তৈরি করে আপনার পিঠে ছুঁড়েছিল। ওরা কয়েকজন জোট বেঁধেছে সৌরভকে স্কুল থেকে তাড়ানোর জন্য। এক্ষুণি তাই নিয়ে ক্লাসে ওরা বলাবলি করছে। তাছাড়া আমরা তো নিজে দেখেছি। মদন সব থেকে দুষ্টু ছেলে—
—সত্যি বলছ?
—হ্যাঁ স্যার। ও ক্লাসে প্রথম হয় বলে সবাই মিলে ওর পেছনে লাগে, যাতে ও প্রথম না হয়।
—বেশ। তোমরা ক্লাসে যাও। আমি এক্ষুনি যাব সৌরভের বাড়িতে। আমার খুব ভুল হয়ে গেছে তাহলে। ফিরে এসে আমি মদনদের দলের ব্যবস্থা করছি।
হেড স্যার তাড়াতাড়ি সৌরভের বাড়ি গেলেন। গিয়ে দেখলেন, সৌরভ মন দিয়ে আগামী সাত দিনের পড়া নিজেই পড়ার চেষ্টা করছে।
